লালগোলা মাতৃধাম
মায়ের আরাধনায় ঐতিহ্যের জাগরণ, মাতৃভূমির চেতনায় লালগোলা।
পদ্মার শিয়রে, যেখানে গঙ্গা দু’ভাগ হয়ে বাংলার বদ্বীপের প্রথম রেখা টানে, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন জনপদ—লালগোলা। এখানকার মাটিতে নদী রেখে গেছে পলি, সন্ন্যাসীরা রেখে গেছেন তাঁদের রাম, রাজারা রেখে গেছেন মন্দির আর বিদ্যালয়, আর এক সাহিত্যিক রেখে গেছেন এক মন্ত্র—যা পরে হয়ে উঠবে গোটা জাতির প্রাণের ধ্বনি: বন্দে মাতরম্।
এই সব স্মৃতির কেন্দ্রে, রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে, অমাবস্যার মতো গভীর আর প্রদীপের মতো উজ্জ্বল হয়ে বিরাজ করছেন মা কালী—রাজরাজেশ্বরী রূপে। তাঁকে ঘিরেই লালগোলা মাতৃধাম—ভক্তি, ইতিহাস, সাহিত্য ও মানুষের মিলিত উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত তীর্থ।
কালীপুজো ২০২৬ — রবিবার, ৮ নভেম্বর
দীপান্বিতা অমাবস্যার রাতে মা রাজরাজেশ্বরীর সারারাতব্যাপী দিব্য আরাধনা। সন্ধ্যার প্রদীপ থেকে ভোরের আলো পর্যন্ত—সকল ভক্তকে আন্তরিক আমন্ত্রণ।
নদী যাঁকে ভাসিয়ে আনল
[ঐতিহ্য] লোককথা বলে, এক রাতে লালগোলার রাজা রাও রামশঙ্কর রায় স্বপ্নে দেখলেন—নদীর চরে মা অপেক্ষা করছেন। স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে যিনি এসে থেমেছিলেন পদ্মার বালুচরে, রাজা তাঁকে বরণ করে আনলেন রাজবাড়ির সামনের পাকা দালানে। সেদিন থেকে নদীর দেবী হয়ে উঠলেন জনপদের মা।
তাই হয়তো আজও মায়ের ভোগে অন্নের পাশে থাকে ইলিশ—নদীমাতৃক বাংলার এক অকৃত্রিম প্রণাম। কথিত আছে, মায়ের দু’পাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী; কাছেই রঘুনাথ জিউয়ের মন্দির, ঠাকুরদালান আর শিবমন্দির। ইট-পাথরের এই প্রাঙ্গণ আসলে প্রজন্মের পর প্রজন্মের প্রণাম জমে তৈরি এক স্মৃতিসৌধ।
যে মাটিতে জন্ম নিল এক মন্ত্র
[ঐতিহ্য] ১৮৭৩ সালের শেষ দিক। ব্রিটিশ কর্তাদের রোষে পড়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আশ্রয় নিলেন লালগোলার রাজা যোগেন্দ্রনারায়ণ রায়ের রাজবাড়িতে। জগদ্ধাত্রী, দুর্গা আর কালীর মন্দিরে তাঁর যাতায়াত ছিল নিত্য। লালগোলার মানুষ বিশ্বাস করেন, ১৮৭৪ সালের মাঘী পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায়, এই মাটিতেই তাঁর কণ্ঠে প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল দুটি শব্দ—বন্দে মাতরম্।
ইতিহাসের খাতায় গানটি প্রথম ছাপা হয় ‘বঙ্গদর্শন’-এ, ৭ নভেম্বর ১৮৭৫; পরে তা ঠাঁই পায় ‘আনন্দমঠ’-এ (১৮৮২)। তারপর সেই গান পৌঁছেছে কংগ্রেসের মঞ্চে, স্বদেশির মিছিলে, অগণিত বিপ্লবীর কণ্ঠে। আজ দেশ যখন সেই মন্ত্রের দেড়শো বছর পালন করছে, লালগোলা নিঃশব্দে মনে করিয়ে দেয়—প্রতিটি মহাকাব্যের একটি শুরুর রাত থাকে।
মন্দির কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা নয়। প্রতিদিনের প্রদীপ, প্রণাম, মন্ত্র আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বলা গল্প—এসব মিলেই একটি মন্দির জীবন্ত থাকে।
সন্ন্যাসীর রাম, ফকিরের দোয়া
লালগোলার ইতিহাসকে কোনো একটি সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে বাঁধা যায় না। অষ্টাদশ শতকের সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিলেন হিন্দু সন্ন্যাসী আর মুসলমান ফকির। [ঐতিহ্য] লোকস্মৃতি বলে, সেই বিদ্রোহে যোগ দিতে যাওয়ার পথে একদল সন্ন্যাসী এখানে রেখে গিয়েছিলেন তাঁদের আরাধ্য রঘুনাথকে—আর কখনো ফেরেননি।
এই জনপদেরই মহেশ নারায়ণ একাডেমির ইতিহাসে উল্লেখ আছে কাজী নজরুল ইসলামের নাম—যিনি একই কলমে লিখেছেন শ্যামাসংগীত আর ইসলামি গান। এক হাতে মন্দির, অন্য হাতে বিদ্যালয়, গ্রন্থাগার আর মাদ্রাসা—এই ছিল লালগোলার মন; আর বারো মাসে তেরো পার্বণের এই শহরে দুর্গাপুজো আর ঈদ আজও সমান আনন্দের।
মাতৃধামের অঙ্গীকার
লালগোলা মাতৃধাম শুধু একটি মন্দিরের পরিচয় তুলে ধরতে চায় না। আমাদের লক্ষ্য—লালগোলার বিস্মৃত ইতিহাস, সাধনা ও সংগ্রামের স্মৃতি, নদীসভ্যতা, শিক্ষাচর্চা আর মানুষের মিলিত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া।
এখানে দলিলের যেমন মর্যাদা, প্রবীণের স্মৃতিরও তেমন। তবু দুটিকে আমরা আলাদা করে চিনিয়ে দিই—যাতে বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে, আবার সত্য অনুসন্ধানের দরজাও খোলা থাকে। দেশপ্রেম মানে শুধু অতীতের গৌরব নয়; নিজের শিকড়কে জানার সাহস, আর মানুষে মানুষে সেতু গড়ার দায়িত্বও।
মায়ের দুয়ারে আসুন
ভক্ত হয়ে আসুন, পর্যটক হয়ে আসুন, ইতিহাসের খোঁজে আসুন—মায়ের দুয়ার সবার জন্য খোলা। দর্শন ও পুজোর সময়, অন্নভোগ বা অন্নপ্রাশনের মতো সেবা, আর লালগোলায় পৌঁছনোর পথ—সব তথ্য রইল নিচে।
পুরোনো ছবি, দলিল বা লালগোলার ইতিহাস নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকলে আমাদের জানান—মাতৃধামের এই যাত্রায় আপনিও সহযাত্রী।
