একদিকে গঙ্গার ভাগীরথী ধারা, অন্যদিকে পদ্মা। মাঝখানে এক ছোট্ট জনপদ—লালগোলা। এই মাটিতে এক সন্ন্যাসীদল রেখে গিয়েছিলেন তাঁদের রামকে, এক রাজা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নদীর চরে পাওয়া মাকে, আর এক সাহিত্যিক খুঁজে পেয়েছিলেন এক মন্ত্র—‘বন্দে মাতরম্’। এ পাতায় সেই কাহিনি—যতটা নথি বলে, আর যতটা মানুষের স্মৃতি বলে। লোকস্মৃতিনির্ভর অংশগুলি আমরা [ঐতিহ্য] চিহ্ন দিয়ে আলাদা করে চিনিয়ে দিয়েছি।
১. দুই নদীর মাঝের জনপদ
গঙ্গা বাংলায় ঢুকে দুই ধারায় ভাগ হয়েছে। এক ধারা ভাগীরথী-হুগলি হয়ে মুর্শিদাবাদ ও কলকাতার পাশ দিয়ে সাগরে মিশেছে; অন্য ধারা পদ্মা হয়ে পূর্ব বাংলার বুক চিরে গেছে। এই ভাগ হওয়ার ঠিক মুখে, বদ্বীপের শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে লালগোলা। উত্তর ও পূর্বে পদ্মা, নদীর ওপারে আজকের বাংলাদেশের গোদাগাড়ি; পশ্চিমে ভাগীরথীর তীরে মুর্শিদাবাদ—যে শহর ১৭১৭ সালে বাংলা সুবার রাজধানী হয়েছিল।
এমন দেশে নদীই ছিল রাজপথ। ধান, পাট আর নানা কৃষিপণ্য লালগোলায় জড়ো হত, সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে। শহরের চারপাশে অসংখ্য দিঘি আর আমবাগান। এখানে নানা ধর্মের মানুষ পাশাপাশি থাকেন—তাই প্রবাদ বলে, বারো মাসে তেরো পার্বণ; দুর্গাপুজো যেমন, ঈদও তেমনই এ শহরের আনন্দ। লালগোলা স্টেশন থেকে কৃষ্ণপুর স্টেশনের দূরত্ব মাত্র ১.৭ কিলোমিটার—ভারতের দুই রেলস্টেশনের মধ্যে স্বল্পতম দূরত্বগুলির একটি। সব মিলিয়ে লালগোলা ছিল নদী ও সীমান্তের এক বাণিজ্য-জনপদ, বদ্বীপ-বাংলার এক প্রবেশদ্বার।
২. রাজবাড়ি ও রাজপরিবার
রাজবাড়ির কথা বলতে গেলে প্রথমে আসে রাও রামশঙ্কর রায়ের নাম—কথিত আছে, তিনিই স্বপ্নাদেশ পেয়ে মায়ের পুজো শুরু করেন। এই বংশেরই রাজা যোগেন্দ্রনারায়ণ রায়, পরে মহারাজা, লালগোলাকে ইতিহাসের মানচিত্রে বসিয়ে দেন। গবেষক কিষাণচন্দ্র ভকতের মতে তিনি নিজেও ছিলেন তন্ত্রসাধক। রাজপরিবারের গুরু ছিলেন পণ্ডিত কালীব্রহ্ম ভট্টাচার্য, আর রাজসভার কবি ও পুরোহিত ছিলেন ত্রৈলোক্যনাথ স্মৃতিভূষণ।
কিন্তু সাধনা শুধু মন্দিরের ভেতরে আটকে থাকেনি। ১৯১৩ সালে গড়ে ওঠে মহেশ নারায়ণ একাডেমি টাউন লাইব্রেরি, ১৯১৪ সালে মহেশ নারায়ণ একাডেমি—যেখানে আজ দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়—আর ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত রহমতুল্লাহ হাই মাদ্রাসাও মহারাজার পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। এক হাতে মন্দির, অন্য হাতে বিদ্যালয়, গ্রন্থাগার আর মাদ্রাসা—এই ছিল লালগোলার মন।
পরে এই বংশের বীরেন্দ্রনারায়ণ রায় (বিরেন রায়) রাজবাড়ি সরকারকে দান করেন। ১৯৮৭ সালে প্রাসাদে চালু হয় পশ্চিমবঙ্গের মুক্ত বায়ু সংশোধনাগার—প্রায় একশো একর জমিতে, হাজারখানেক আমগাছের ছায়ায়।
৩. নদীতে ভেসে আসা মা
[ঐতিহ্য] লালগোলার কালীবাড়ির মায়ের কাহিনি শুরু এক স্বপ্নে। কথিত আছে, রাও রামশঙ্কর রায় একরাতে স্বপ্ন দেখলেন—কলকলির চরে দেবী রাজরাজেশ্বরী অপেক্ষা করছেন, তাঁকে রাজবাড়িতে এনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। লোকমুখে শোনা যায়, মা কোনও এক সময় মালদহের কোনও জায়গায় পূজিতা হতেন; নদীর স্রোতে ভাসতে ভাসতে এসে থেমেছিলেন পদ্মার চরে। সেই আদেশ মেনে রাজবাড়ির সামনে পাকা দালান তৈরি হল, মা সেখানে অধিষ্ঠিত হলেন।
কত বছর আগের ঘটনা? উত্তর একটা নয়। কোনও সংবাদ ১৭৯০ সালের কথা বলে, কোনওটিতে ‘দুশো বছরের বেশি’; আবার পুরোহিত নিজে ২০২৫ সালে জানিয়েছেন, সঠিক সাল বলা সম্ভব নয়—লোকে বলে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর। লিখিত দলিল প্রকাশিত হয়নি বলেই আমরা সবকটি মত লিখে রাখছি—ঐতিহ্যের সততা এটাই।
[ঐতিহ্য] মায়ের রূপও আলাদা। কথিত, মায়ের পাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী; এক হাতে খড্গ, অন্য হাতে বরাভয়, আর বাকি দুই হাত করতালির ভঙ্গিতে। ভোগে অন্ন, আর পুরোনো রীতিতে ইলিশ—বাংলার নদীমাতৃক সংস্কৃতির এক খাঁটি ছাপ। লোকবিশ্বাস বলে, যে মাকে নদী ভাসিয়ে এনেছিল, সেই মায়ের চরণেই একদিন এসে দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, নজরুল ও রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী।
৪. সন্ন্যাসীদের প্রতিশ্রুতি
১৭৬৩ থেকে ১৮০০—প্রায় চার দশক ধরে বাংলায় চলেছিল সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ। কোম্পানির শাসনের অত্যাচার আর দুর্ভিক্ষে অতিষ্ঠ হিন্দু সন্ন্যাসী ও মুসলমান ফকির হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। ভবানী পাঠক, মজনু শাহ, মুসা শাহ, চিরাগ আলি, দেবী চৌধুরাণীর নাম আজও মানুষ মনে রেখেছে।
[ঐতিহ্য] লালগোলায় প্রচলিত কাহিনি বলে, সেই সময় দিনাজপুরের একদল সন্ন্যাসী এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের দলপতি স্থানীয় জমিদারের হাতে তুলে দিলেন তাঁদের আরাধ্য বিগ্রহ—শ্রীরাম, সীতা, লক্ষ্মণ, হনুমান, রাধাকৃষ্ণ আর কয়েকটি শালগ্রাম শিলা। জানালেন, তাঁরা বিদ্রোহে যোগ দিতে যাচ্ছেন; নির্দিষ্ট সময়ে না ফিরলে বিগ্রহ জমিদারেরই থাকবে। তাঁরা আর ফেরেননি। জমিদার সেই বিগ্রহের জন্য গড়লেন রঘুনাথের মন্দির—যা আজও কালীবাড়ির কাছেই দাঁড়িয়ে।
লালগোলার লোকস্মৃতি তাই এক অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির কথা বলে। লড়াইয়ের আগুন ধীরে নিভে গিয়েছিল, কিন্তু সেই আদর্শ হারিয়ে যায়নি—লোকবিশ্বাসে তা ফিরে এসেছিল শব্দ হয়ে, মন্ত্র হয়ে। কয়েক পুরুষ পরে সেই মাটিতেই আশ্রয় নিলেন এক লেখক, যিনি সন্ন্যাসী-বিদ্রোহের গল্প অমর করে রাখবেন ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২) ও ‘দেবী চৌধুরাণী’ (১৮৮৪)-তে। আর মনে রাখতে হবে—এ বিদ্রোহ ছিল হিন্দু সন্ন্যাসী ও মুসলমান ফকিরের যৌথ লড়াই; ইতিহাসের এই ঐক্যই লালগোলার প্রকৃত উত্তরাধিকার।
৫. বঙ্কিমচন্দ্র ও ‘বন্দে মাতরম্’
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ‘বন্দে মাতরম্’ প্রথম প্রকাশিত হয় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায়, ৭ নভেম্বর ১৮৭৫। পরে গানটি ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত হয়, যা ১৮৮২ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৮৯৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানটি গেয়েছিলেন; ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে এটি হয়ে ওঠে এক শক্তিশালী প্রতীক। ১৯৫০ সালে গণপরিষদের সভাপতি ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষণা করেন, ‘জনগণমন’-র সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম্’-ও সমান সম্মান পাবে।
[ঐতিহ্য] এই জাতীয় ইতিহাসের পাশাপাশি লালগোলা লালন করে নিজের স্মৃতি। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, ১৮৭৩ সালের শেষ দিকে বঙ্কিমচন্দ্র রাজা যোগেন্দ্রনারায়ণ রায়ের আশ্রয়ে রাজবাড়িতে ছিলেন, মায়ের মন্দিরে যাতায়াত করতেন, আর ১৮৭৪ সালের মাঘী পূর্ণিমার রাতে এই মাটিতেই তাঁর কণ্ঠে প্রথম উচ্চারিত হয় ‘বন্দে মাতরম্’। খুঁটিনাটি প্রতিষ্ঠার জন্য আরও নথি, চিঠিপত্র, সমকালীন সংবাদপত্র ও গবেষণা প্রয়োজন। সযত্নে উপস্থাপন করলে এই দাবির গুরুত্ব কমে না, বরং বাড়ে—লালগোলার এই সংযোগ সংরক্ষণ, গবেষণা ও আলোচনার যোগ্য।
৬. নজরুল, বরদাচরণ ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি
লালগোলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মহেশ নারায়ণ একাডেমির বিশেষ স্থান। বিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাস শ্রী বরদাচরণ মজুমদারকে প্রথম প্রধান শিক্ষক হিসেবে চিহ্নিত করে, তাঁর যোগসাধনার কথা বলে, আর কাজী নজরুল ইসলামকে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের মধ্যে উল্লেখ করে। নজরুল ও বরদাচরণের গুরু-শিষ্য সম্পর্ক নিয়ে বাংলা লেখায় আলোচনা পাওয়া যায়; তার সুনির্দিষ্ট সময় ও পরিসর নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও নজরুল রচনা করেছেন অজস্র শ্যামাসংগীত, ভজন ও কীর্তন; একই সঙ্গে ইসলামি ভক্তিগীতিকেও দিয়েছেন নতুন প্রাণ। তাঁর সৃষ্টি ধর্মের সীমানা পেরিয়ে মানুষের আবেগ, প্রেম, বিদ্রোহ আর মাতৃভাবের কথা বলে। মা কালীর এই প্রাঙ্গণে নজরুলের স্মৃতি তাই বাংলার যৌথ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারেরই উদ্যাপন।
৭. স্মৃতি থেকে দায়িত্বে
অতীত শুধু গৌরবের অলংকার নয়, তা এক দায়িত্বও। মন্দিরের স্থাপত্য, প্রতিমা, পূজার রীতি, রাজবাড়ির স্মৃতি, রঘুনাথ জিউয়ের বিগ্রহ, নদীপথের ইতিহাস, শিক্ষা ও সংগীত—সবকিছুকে নথিভুক্ত করা আর নতুন প্রজন্মের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।
মা রাজরাজেশ্বরীর পবিত্র উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে লালগোলা হয়ে উঠুক এমন এক স্থান, যেখানে ভক্তি মানুষকে ইতিহাসের কাছে নিয়ে যায়, ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় দায়িত্বের কথা, আর ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চিনিয়ে দেয় নিজের শিকড়।
পুরোনো দলিল, ছবি, চিঠি বা নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকলে অনুগ্রহ করে যোগাযোগ করুন। যাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ করাই আমাদের অঙ্গীকার।
